শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৪

আজ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী


আজ ১৯ জানুয়ারি রোববার মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী। তিনি ছিলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতীক। ১৯৩৬ সালের এমনি এক শীতার্ত দিনে তিনি বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় বাগবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। মাতা-পিতা তখন আদর করে নাম রাখেন কমল। দেশ, মাটি ও মানুষের জন্যে আমৃত্যু নিবেদিতপ্রাণ এই ব্যক্তিত্বের পরিচিতি সর্বজনবিদিত। দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, অসাধারণ দেশপ্রেমিক, অসম সাহসী ও সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে জিয়াউর রহমান ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার জন্মদিন পালন উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ দল নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে। জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তার কর্মময় জীবনের ওপর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম বিশেষ ক্রোড়পত্র ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মহান স্বাধীনতার ঘোষক এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান এদেশের মানুষের কাছে প্রথম পরিচিত হলেও পরে তিনি বাংলাদেশের একজন বরেণ্য রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন। আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনের মধ্য দিয়ে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির সূচনা করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নতুন দর্শন উপস্থাপন করেন জিয়াউর রহমান। তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়ে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি এগিয়ে নিয়ে যান। তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি দেশের মানুষের কাছে প্রিয় দল হিসেবে ’৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ, ’৯১ সালের ৫ম সংসদ, ৬ষ্ঠ ও ৮ম সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। স্বৈরশাসকের অধীনে অনুষ্ঠিত ’৮৬ সালের তৃতীয় ও ’৮৮ সালের ৪র্থ সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। এছাড়া সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন মহাজোটের অধীনে অনুষ্ঠিত একতরফার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ দল। এই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিই ছিল না। বাকি ১৪৭ আসনের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল বলে বিভিন্ন সংগঠন দাবি করে। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটসহ অন্যান্য বিরোধী দলও এই নির্বাচন বর্জন করে। একতরফার এই নির্বাচনে সমর্থন জানায়নি দেশী-বিদেশী কোনো সংস্থাই।
সূত্র মতে, ১৯৭১ সালে তার স্বাধীনতার ঘোষণা যেমন এদেশের মুক্তিকামী মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল, তেমনি ’৭৫ সালে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির মুখে, তখন সিপাহি-জনতার যে অভ্যুত্থান হয় তারই ধারাবাহিকতায় তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন হন। তিনি একদলীয় বাকশালের পরিবর্তে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর মাত্র চারটি দৈনিক পত্রিকা রেখে অন্য সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। হরণ করা হয়েছিল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও ফিরিয়ে দেন। পররাষ্ট্র নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন করে জিয়াউর রহমান চীনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সূচনা করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৭টি দেশকে নিয়ে ‘সার্ক’ গঠনের উদ্যোগ জিয়াউর রহমানেরই। ওআইসিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর সংহতি জোরদার করার জন্য তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এ পর্যন্ত পাঁচবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী দলটি এখনও দেশের প্রধান বিরোধী দল। আগামী ২৪ জানুয়ারি নবম সংসদের মেয়াদ শেষ হবে। যদিও এরই মধ্যে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।
মির্জা ফখরুলের বাণী : শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেয়া বাণীতে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শনের দিশারী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। তার রুহের মাগফিরাত কামনা করি। তিনি বলেন, এদেশের এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। মাতৃভূমির মুক্তির জন্য নেতৃত্বহীন জাতির দিশারী হয়ে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেন। স্বাধীনতাত্তোর দুঃসহ স্বৈরাচারী দুঃশাসনে চরম হতাশায় দেশ যখন নিপতিত, জাতি হিসেবে আমাদের এগিয়ে যাওয়া যখন বাধাগ্রস্ত ঠিক তখনই জিয়াউর রহমান জনগণের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, মিথ্যা প্রতিশ্রুতির অপরাজনীতি দ্বারা জনগণকে প্রতারিত করে স্বাধীনতাত্তোর ক্ষমতাসীন মহল যখন মানুষের বাক-ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে হরণ করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিলো, দেশকে ঠেলে দিয়েছিলো দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে-এমনি জাতির এক চরম সংকটময় মুহূর্তে সৈনিক জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে শহীদ জিয়া ক্ষমতার হাল ধরেন। ক্ষমতায় এসেই মানুষের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পূনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, নিশ্চিত করেন মানুষের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা। উৎপাদনের রাজনীতি প্রবর্তন করে তিনি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তাঁর তীব্র গণতান্ত্রিক চেতনা এবং দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। শহীদ জিয়া ছিলেন আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক আপোষহীন দেশপ্রেমিক। তাই দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেদের নীলনক্শা বাস্তবায়নের কাঁটা ভেবে জিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কিন্তু তার এই আত্মত্যাগ জনগণের মধ্যে গড়ে উঠেছে দেশবিরোধী চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে এক ইস্পাতকঠিন গণঐক্য। শহীদ জিয়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শনেই  আমাদের জাতিসত্ত্বার সঠিক স্বরূপটি আবিষ্কৃত হয়-যা আমাদের ভৌগোলিক জাতিসত্ত্বার সুনির্দিষ্ট পরিচয় দান করে। বিশ্ব মানচিত্রে আমাদের আত্মপরিচয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখারও সাহসী অঙ্গীকার। শহীদ জিয়ার জন্মদিনে তার প্রদর্শিত পথেই বর্তমানের অগণতান্ত্রিক শক্তি ও আধিপত্যবাদের ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করে জনগণের ঘাড়ে চেপে বসা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাভূত করতে হবে। আমি এই মহান রাষ্ট্রনায়কের জন্মবার্ষিকীতে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, মানুষের ভোটাধিকার, ন্যায়-বিচার এবং মৌলিক ও মানবাধিকার সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য দেশবাসীসহ সকলের প্রতি আহবান জানাই।
কর্মসূচি : বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের জন্য নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। এর মধ্যে আজ রোববার ভোর ৬টায় সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন (সারা দেশে), সকাল সাড়ে ১০টায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ফাতেহা পাঠ ও পুস্পস্তবক অর্পণ। এছাড়া দিনটি উপলক্ষে বিএনপির উদ্যোগে গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। একইভাবে সারা দেশে আলোচনা সভা করবে বিভিন্ন ইউনিট কমিটি।
এছাড়া শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে র‌্যালি, আলোকচিত্র প্রদর্শন, আলোচনা সভা, পোস্টার, লিফলেট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে নানান কর্মসূচি পালন করছে। এদিকে জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়ার মাজার প্রাঙ্গণে আজ স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি পালন করবে ড্যাব। এছাড়া বিকেলে দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন